$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0

ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা- অদ্ভুত কিন্তু সত্য (২য় পর্ব)

অনেক সময় আমরা রূপকথার কাহিনী শুনি। অদ্ভুত সব ঘটনা শুনি আর অবাক হই। ভাওয়াল সন্নাসী মামলার কাহিনী যেন রূপকথার কাহিনীকেও হার মানায়। এই মামলার...

অনেক সময় আমরা রূপকথার কাহিনী শুনি। অদ্ভুত সব ঘটনা শুনি আর অবাক হই। ভাওয়াল সন্নাসী মামলার কাহিনী যেন রূপকথার কাহিনীকেও হার মানায়। এই মামলার কাহিনী অদ্ভুতুড়ে হলেও সত্য। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এই কাহিনী আমাদের বাংলাদেশের কাহিনী।  যে কাহিনী সারা বিশ্বকে সেই সময় অবাক করে দিয়েছিল। আজও সেই কাহিনী পড়লে যেন মনে হয় রূপকথার কোন কাহিনী পড়ছি।শুধু তাই নয় ফরেনসিক বিজ্ঞানের জন্য এই মামলাটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলাতে মানুষের পরিচয় বের করার কলাকৌশলের যথেষ্ট প্রয়োগ ঘটেছে।  ঘটনাটি গাজীপুরের ভাওয়াল এস্টেটকে কেন্দ্র করে। এক ব্যক্তি মারা যাওয়ার দশ বছর পর সেই ব্যক্তি হটাৎ সন্ন্যাসবেশ ধারণ করে দৃশ্যপটে হাজির হন। শুরু হয় নিজেকে জীবিত প্রমাণ করার লড়াই। সম্পত্তির হিস্যা পাওয়ার লড়াই। শুরু হয় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। পরিশেষে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। লাখ লাখ মানুষের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এই মামলা।

আরো পড়ুন
ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা-অদ্ভুত কিন্তু সত্য (১ম পর্ব)


ভাওয়াল সন্নাসী মামলা (২য় পর্ব)

সেরাতে দার্জিলিং শ্মশানের সন্নিকটে একটি গুহার মধ্যে ৪জন নাগা সন্ন্যাসী ধর্মালোচনায় মশগুল ছিল। বাইরে হরিবোল, হরিবোল ধ্বনি শুনতে পেয়ে সন্ন্যাসীদের গুরু লোকনাথজী দর্শন দাসকে বাইরে কি হচ্ছে দেখতে পাঠান। দর্শন দাস শ্মশানে লোকজন জমায়েত হয়েছে দেখে বিষয়টি বাবাজীকে জানান। আকাশ মেঘে ঢেকে গেল, শুরু হলো প্রচন্ড ঝড় আর বর্ষণ। অনেক রাতে বাবাজী অর্থাৎ লোকনাথ বাইরে যেয়ে লোকজন জমায়েতের বিষয়ে দেখে আসতে বলেন। তখন বৃষ্টি প্রায় থেমে গেছে। দর্শন দাস বাইরে এসে শুনতে পান যে, শ্মশান হতে কেমন একটি শব্দ উত্থিত হচ্ছে। তখন সন্ন্যাসীরা লন্ঠন নিয়ে ঘটনাস্থলে যেয়ে দেখেন যে, খাটিয়ার উপর একটি লোক শুয়ে আছে। লোকটির শরীরের উপর থেকে কাপড়টি সরিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পান লোকটি জীবিত আছে। সন্ন্যাসীরা লোকটিকে ধরা ধরি করে গুহায় নিয়ে যান। তার ভিজে কাপড় গা থেকে খুলে শুকনো কাপড় জড়িয়ে দেন। পরদিন তাকে আরও নিচে একটি কুটিরে নিয়ে রাখে। সেখানে তার জ্ঞান ফিরলে সে কিছুই বলতে পারেনা। 

এরপর নাগা সন্ন্যাসীরা তাকে সংগে নিয়ে বহু অরণ্য, পাহাড়, গুহা, হিমালয় পর্বত, তিববত প্রভৃতি জায়গায় ভ্রমণ করে। লোকটি তার পরিচয় বা নাম পর্যন্ত মনে করতে পারে না। সে কারণে তার পরিচিতির জন্য ডান বাহুতে উর্দু অক্ষরে উল্কি দিয়ে লিখে রাখেন ’’বাবা ধরম দাসকা চেলা নাগা’’ অর্থাৎ সন্ন্যাসী বাবা ধরম দাসের নাগা চেলা। পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, নগর-জনপদ ঘুরতে ঘুরতে একদিন ১৯২১ সালের ৪মে ঐ চেলা নাগা সন্ন্যাসী ঢাকায় উপস্থিত হন। ঢাকা শহরের এক প্রান্তে সদর ঘাটের পূর্বদিকে বাঁধের উপর সন্ন্যাসীদের আখড়ায় এক সকালে নতুন সন্ন্যাসীকে বসে থাকতে দেখা গেল। মাত্র পঁয়ত্রিশ/ চল্লিশ বছর সয়সী সন্ন্যাসী, সর্ব শরীর উদাম, লেংটি পরিহিত, সারা দেহ ভস্মাচ্ছাদিত, মাথায় প্রলম্বিত চুলের জটা, দাড়ি গোঁফে মুখাচ্ছাদিত। নতুন সন্ন্যাসীকে দেখার জন্য মুহূর্তের মধ্যে ভিড় জমে গেল। ভক্তরা পদধুলি নেয়, সন্ন্যাসী মুদিত নয়নে ঈশ্বরের কাছে মঙ্গল কামনা করে, আর আশীর্বাদ দিয়ে হাতে তুলে দেয় একটি এলাচ দানা। দর্শনার্থীদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। অনেকেই বলতে লাগল এ যে ভাওয়ালের মেজোকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী। সন্ন্যাসী নিজের পরিচয় দেয় না, কথা বলে না। খবর পৌঁছে গেল কাশিমপুরের জমিদার অতুল প্রসাদ রায় চৌধুরীর কাছে। তিনিও এলেন। 



সন্ন্যাসীকে দেখতে অবিকল মেজোকুমারের মত। এ বিষয়ে প্রশ্ন করে কোন জবাব মেলে না। কিছু দিন পর অতুল প্রসাদ তাঁর পুত্রের যজ্ঞ উপলক্ষে সন্ন্যাসীকে নিয়ে এলেন কাশিমপুর। জয়দেবপুর হতে কাশিমপুর বেশী দূরে নয়। এ নতুন সন্ন্যাসীর আগমন বার্তা পৌঁছে গেল মেজোবোন জ্যোতির্ময়ী দেবীর কাছে। অতুল প্রসাদ সন্ন্যাসীকে হাতির পিঠে বসিয়ে পাঠিয়ে দিলেন জয়দেবপুর। দূর-দূরান্ত হতে প্রজারা ছুটে এলো সন্ন্যাসীকে এক নজর দেখার জন্য। যে দেখে সেই বলে, এইতো মেজোকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ। নিয়ে যাওয়া হলো রাজবাড়িতে। বিলাস মণি উচ্চ বিদ্যালয়, মাবধবাড়ি, জয়দেবপুরের গাছপালা, রাস্তাঘাট, রাজবাড়ি এসব দেখে সন্ন্যাসীর ভাবান্তর হতে থাকে–ধীরে ধীরে তাঁর লুপ্ত স্মৃতি জাগরিত হয়ে উঠে। বোন জ্যোতির্ময়ী, রাণী সত্যভামা দেবী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন সন্ন্যাসীকে। সেই অবয়ব, সেই চক্ষুদ্বয়, কান, ওষ্ঠ, শরীর, হাত-পা, মুখের গঠন ইত্যাদি। এ এক কঠিন সমস্যা। সন্ন্যাসী নিজে কিছু বলেন না-বাংলাও বোঝেন না। জ্যেতির্ময়ী দেবী অতীত স্মৃতি তুলে ধরে–সে যে তাদের মেজোকুমার তা স্বীকার করতে বলেন। সন্ন্যাসী গর্জে উঠেন–নেই, নেই হাম, তোমারা কৈ নেহি হ্যায়। ভাওয়ালের প্রজাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এক নজর দেখার জন্য লোকজন ছুটে আসে। এক বিরাট গণজমায়েত সৃষ্টি হয়। হাজার হাজার মানুষ সন্ন্যাসীকে চিনতে পারে, তারা এক বাক্যে স্বীকার করে সন্ন্যাসীই হারিয়ে যাওয়া মেজোকুমার। ধীরে ধীরে সন্ন্যাসীর হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি, কথা, ছবি, চোখের ও মনের পর্দায় ভেসে উঠতে থাকে। মনে পড়ে দার্জিলিংএ ডাঃ আশুতোষ কর্তৃক বিষ প্রয়োগের কথা, মনে পড়ে চেতনা ফিরে পেয়ে নিজেকে কয়েকজন নাগা সন্ন্যাসীর মধ্যে আবিষ্কার করার কথা। নিজ পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে সন্ন্যাসীরা তা বলে না বা বলতেও পারে না। তারপর ১২ বছর যাবৎ সন্ন্যাসীদের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছে কত গহীন বন-জঙ্গল, নগর, জনপদ, হিমালয়, গিরি-গুহা, তিববত আর নেপাল। 

পুরাতন রাজবাড়ি, রাস্তাঘাট, স্কুল, মাধববাড়ি, ঠাকুরমা, বোন জ্যেতির্ময়ী আর চেনা-জানা লোকগুলো ক্রমশঃ চেনা চেনা মনে হয়। চিনতে পারে ব্যবহার্য্য জিনিসপত্র। বোন জ্যেতির্ময়ী আর ঠাকুরমা রাণী সত্যভামা দেবী মেজোকুমারের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য অনুনয় বিনয় করে আবেদন করেন ঢাকার কালেক্টর বাহাদুর লিন্ডসের কাছে, কোর্ট অব ওয়ার্ডসের মালিক বোর্ড অব রেভিনিউ এর কাছে। সত্যেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সে বিভিন্ন প্রকার সার্টিফিকেট আর সাক্ষ্য যোগাড় করে বোর্ড অব রেভিনিউ এবং ঢাকার কালেক্টরকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, সন্ন্যাসী একজন প্রত্যারক, ঠগ ও জোচ্চোর। সে একজন নাগা সন্ন্যাসী। জ্যোতির্ময়ী দেবীসহ আরো কয়েকজনে মিলে মেজোকুমারের ন্যায় দেখতে সন্ন্যাসীকে মেজোকুমার সাজিয়ে জমিদারি করতলগত করে আত্মসাত করতে চায়। প্রজাসাধারণ মেনে নিতে চায় না এ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। তারা রুখে দাঁড়ায়। পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় বাবর আলী। সন্ন্যাসীকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে জয়দেবপুর গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে কালেক্টর লিন্ডসে। ইংরেজ সরকার ভয় পেয়ে যায় সন্ন্যাসীকে। এস্টেটের কর্মচারীদেরকে ভয় দেখায় যাতে তাকে কেউ সমর্থন না করে। প্রজাদের করে ফেলে দ্বিধাভক্ত। সন্ন্যাসীকে কোলকাতায় নিয়ে যাওয়া হলো। এখানে সে ভাওয়াল রাজপুত্র হিসেবে চলাফেরা করে। বিভাবতীকে দেখার জন্য ছুটে যায় ১৯নং ল্যান্স ডাউন রোডের বাড়ির সন্নিকটে। বিভাবতী সন্ন্যাসীকে কোলকাতার আরো কয়েক স্থানে দেখতে পেল। কিন্তু, স্বামী যে তার জীবিত আছে এ কথা স্বীকার করলো না। বরং ভাইয়ের পক্ষাবলম্বন করলো। এছাড়া তাঁর উপায়ও ছিল না।



এর নয় বছর পর ১৯৩০ সালের ২৪ এপ্রিল সন্ন্যাসী বাদি হয়ে ঢাকার প্রথম সাব জজ আদালতে তাঁর বেঁচে থাকার বিষয়ে স্বীকৃতি আদায় ও সম্পত্তির অংশ ফিরে পাওয়ার দাবিতে রুজু করলেন মামলা নম্বর ৭০/১৯৩০।  মামলার মূল বিবাদি শ্রীমতি বিভাবতী দেবী, পক্ষে কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ম্যানেজার মি. ই.বিগ নোল্ড। মামলার অপরাপর বিবাদি হলেন বড় রাজকুমারের বিধবা স্ত্রী সরযূবালা দেবী, ছোট কুমারের বিধবা স্ত্রী আনন্দ কুমারী দেবী ও দত্তক নাবালক রাম নারায়ণ রায়, পক্ষে কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ম্যানেজার মি. ই. বিগ নোল্ড। বাদির দাবি রমেন্দ্র নারায়ণ হিসেবে নিজের স্বীকৃতি, সম্পত্তির দখল প্রাপ্তি ও মূল প্রতিবাদিনির উপর চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি।

বিবাদি পক্ষের জবাব, আরজি সংশোধন, জবাব সংশোধন ইত্যাদি প্রক্রিয়া শেষে ১৯৩৩ সালে মামলাটি শুনানির জন্য প্রস্ত্তত হয়। অতঃপর মামলাটি দেওয়ানী মামলা নম্বর ৫/১৯৩৩ এ রূপান্তরিত হয়ে প্রথম সাব জজ আদালতে শুনানির জন্য গৃহীত হয়। আদালতের বিচারক সাব জজ জনাব পান্নালাল বসু এম.এ. বি.এল। পান্না লাল বসুর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা আইনী বিশ্লেষণ, কর্মনিষ্ঠা ও সততা ছিল প্রশ্নাতীত। স্থানীয় লোকজন তাঁর বিচার কার্য ও সততায় মুগ্ধ হয়ে বলতো, ’সতী মায়ের পুত্র যারা, ঘুষের টাকা নেয় না তারা’। ১৯৩৩ সালের ২৭ নভেম্বর সাব জজ জনাব পান্নালাল বসু ভুবন বিখ্যাত আড়োলন সৃষ্টিকারী মামলাটি শুনানি শুরু করলেন। ইতিহাসে মামলাটি ’ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা’ নামে খ্যাত। মামলাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি ছুটির দিন ব্যতীত একাদিকক্রমে মামলাটির শুনানি গ্রহণপূর্বক ১৯৩৬ সালের ২১ মে শেষ করেন।

মামলাটির বাদি পক্ষের প্রধান কৌশলী ছিলেন বি.সি চ্যাটার্জী, ব্যারিষ্টার-এট-ল। অপর দিকে বিবাদি পক্ষের প্রধান উকিল ছিলেন এ এন চৌধুরী, বার-এট-ল। মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে সত্য উদ্ঘাটনের জন্য বাদি পক্ষের ১০৬৯ জন এবং বিবাদি পক্ষের ৪৭৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষীদের মধ্যে দেশীয় ও ইউরোপীয় অনেকেই ছিলেন সমাজের উচ্চস্তরের এবং উচ্চ পদের মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। হাতের লেখা, ফটো, শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গ ইত্যাদি প্রমাণের জন্য দেশী-বিদেশী অনেক বিশেষজ্ঞকে সাক্ষী হিসেবে আদলতে উপস্থাপন করা হয়। মামলাটির প্রতিদিনের কার্যক্রম ঢাকা ও কোলকাতার পত্রিকাসমূহে সবিস্তারে প্রকাশিত হতো। শুনানির দিন বিভিন্ন দূরবর্তী এলাকা হতে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্চায় আদালত প্রাঙ্গণে হাজির হয়ে গভীর আগ্রহ নিয়ে প্রতীক্ষা করতো। এ মামলাটি ভারতবর্ষ পেরিয়ে সুদূর ইংরেজ মুল্লুকেও আড়োলন সৃষ্টি করেছিল। শুনানিকালে পান্নালাল বসু ছিলেন সাব জজ। কিন্তু তিন বছর পর রায় প্রদানকালে পদোন্নতি পেয়ে হয়েছিলেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ। মামলা প্রমাণ বা মিথ্যা প্রমাণের জন্য আদালতে ফটো ও নানাবিধ দলিল দস্তাবেজসহ দুই হাজার প্রদর্শনী উপস্থাপিত হয়েছিল। শুনানি শেষে তিন মাস দুই দিন পর ২৪ আগষ্ট বিচারক পান্নালাল বসু জনাকীর্ণ আদালতে ৫৩২ পৃষ্ঠার টাইপ করা এই ঐতিহাসিক মামলার রায় ঘোষণা করেন। তিনি তাঁর ইতিহাস বিখ্যাত রায়টির শেষাংশ পাঠ করে শুনানোর সময় বলেন, ’আমি ঘোষণা করছি যে, এই বাদিই ভাওয়ালের প্রয়াত রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায়ের দ্বিতীয় পুত্র রমেন্দ্র নারায়ণ রায়। আমি আমার রায়ে আরো ঘোষণা করছি যে, তাঁর পিতার সম্পত্তিতে তাঁর অংশীদারিত্ব আছে এবং এই আদেশ দিচ্ছি বিবাদি পক্ষ যে যে সম্পত্তি ভোগ করছেন সে সম্পত্তির একতৃতীয়াংশ সম্পত্তি যা তারা দখল করেছেন, তাঁর দখল যেন বাদিকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। বিবাদীগণের মধ্যে যারা কুমারের বিরোধিতা করেছেন, মামলা চালিয়েছেন তাঁরা শতকরা ছয় টাকা হারে সুদসহ তাঁকে মামলার খরচ দিবেন’।

রায় শুনে আনন্দে কেঁদে উঠলেন মেজোকুমার। বারবার উচ্চারণ করলেন ফিরিয়ে দাও আমার হারানো সোনালী ২৪ বছর। ভাওয়ালের প্রজাবৃন্দ আনন্দে ফেটে পড়লো। অবশেষে সত্যের জয় হলো।

এই মামলায় মেজোকুমারের স্ত্রী বিভাবতী হারানো স্বামীকে চিনতে পেরেও না চেনার ভান করে ভাইয়ের পক্ষ অবলম্বন করেছিল। ছোট কুমারের বিধবা স্ত্রী আনন্দ কুমারী দেবীও বিপক্ষে সাক্ষ্য দেয়।

যাহোক বিবাদী পক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে কোলকাতা হাইকোর্টে আপিল মামলা রুজু করেন। তিনজন বিজ্ঞ বিচারপতি যথাক্রমে জাস্টিস চারু চন্দ্র বিশ্বাস, জাস্টিস কাস্টিলো ও জাস্টিস লজ শুনানীর শেষে প্রথম দুজন পান্নালাল বসুর রায়ের সাথে একমত পোষণ করেন। হাইকোর্টেও পরাস্ত হন বিবাদী পক্ষ। এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলকারীরা প্রিভি কাউন্সিলে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে হাইকোর্টে স্পেশাল লিভ টু আপিল দায়ের করার অনুমতি চেয়ে প্রার্থনা করেছিলেন। লিভ পিটিশনটি শুনানির জন্য বিচারপতি মি. জাস্টিস মিত্র, মি. জাস্টিস খান্দেকর এবং মি. জাস্টিস পলকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল বেঞ্চ। দশ দিন শুনানির পর ১৯৪২ সালের ৩০ জুন হাইকোর্ট লিভ টু আপিল পিটিশনটি খারিজ করে দেন। মাননীয় বিচারপতিরা আবেদনকারীদের সব প্রশ্নের বিবেচনার পরই সবাই একমত হয়ে বলেছিলেন, “For the reasons given above we refuse Certificate and dismiss the application of the petitioners  for leave to Appeal to his Majesty in council with costs to the plaintiff opposite party. Hearing fee is assessed at thirty gold mohurs.”

প্রিভি কাউন্সিলে লিভ টু আপিল দায়েরের জন্য যে লিভ পিটিশনটি বিবাদি পক্ষ হতে দাখিল করা হয়েছিল তা তুলে নেয়ার জন্য বিবাদি পক্ষ আবেদন করলে হাইকোর্ট তা মঞ্জুর করে শেষ পর্যন্ত আদেশ দিয়েছিলেনঃ

“We allow to withdraw the application without prejudice to right to make further application that the petitioners might be advised to make, if and when an application for special leave to his majesty in council is made.”

এ ভাবেই ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার সমাপ্তি ঘটেছিল। মামলাটি সম্পর্কে তখনকার Calcutta weekly note, Times সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মন্তব্য ছিল “Strange but true.”

ভাওয়াল সন্ন্যাসীর এই মামলার কাহিনীকে উপজীব্য করে গ্রন্থিত হয়েছে অসংখ্য উপন্যাস, নাটক আর তৈরী হয়েছে সিনেমা। এখনো থেমে নাই কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার এবং চিত্র নির্মাতারা। এই ঐতিহাসিক মামলার যুক্তিগ্রাহ্য রায় ভারতের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের নানা দেশে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

ফরেনসিক বিজ্ঞানের জন্য এই মামলাটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলাতে মানুষের পরিচয় বের করার কলাকৌশলের যথেষ্ট প্রয়োগ ঘটেছে। কুমার নরেন্দ্রনারায়ণ এবং ভাওয়াল সন্ন্যাসীর দেহের নিম্নলিখিত সাদৃশ্য ছিলো।

নরেন্দ্রনারায়ণ রায়

গায়ের রং গোলাপী ও শ্বেত

চুল হালকা বাদামী   


চুল ঢেউ খেলানো


গোঁফ মাথার চুলের চাইতে পাতলা   


চোখের বর্ণ বাদামী      


ঠোঁট নীচের ঠোট ডানদিকে কুঞ্চিত


কান কিনারার দিকে চোখা


কানের লতি গালের দিকে সংযুক্ত না


কণ্ঠমণি প্রকট     


উপরের বাম দিকের মাড়ির দাঁত ভাঙা


হাত ছোট    


বাম হাতের তর্জনী ও মধ্যমা ডান হাতের চাইতে কম অসম


ডান চোখের নীচেরপাপড়ির আঁচিল বিদ্যমান   


পা খসখসে, জুতার আকার ৬ নাম্বার


বাম গোড়ালিরউপরের দিকে ক্ষত বিদ্যমান


সিফিলিস বিদ্যমান


সিফিলিসের ক্ষত বিদ্যমান


মাথা ও পিঠে ফোঁড়ার দাগ বিদ্যমান                                                     


কুঁচকিতে অস্ত্রোপচারের দাগ বিদ্যমান                  


ডান বাহুতে বাঘেরথাবার আঘাতের দাগ      


শিশ্নের নিম্নভাগে আচিল বিদ্যমান      
ভাওয়াল সন্ন্যাসী

গোলাপী ও শ্বেত


হালকা বাদামী     


ঢেউ খেলানো


গোঁফ মাথার চুলের চাইতে পাতলা 


চোখের বর্ণ বাদামী    


ঠোঁট নীচের ঠোট ডানদিকে কুঞ্চিত 


কান কিনারার দিকে চোখা 


কানের লতি গালের দিকে সংযুক্ত না


কণ্ঠমণি প্রকট     


উপরের বাম দিকের মাড়ির দাঁত ভাঙা


হাত ছোট 


বাম হাতের তর্জনী ও মধ্যমা ডান হাতের চাইতে কম অসম


ডান চোখের নীচেরপাপড়ির আঁচিল বিদ্যমান     


পা খসখসে, জুতার আকার ৬ নাম্বার


বাম গোড়ালিরউপরের দিকে ক্ষত বিদ্যমান


সিফিলিস  বিদ্যমান (বিতর্কিত)


সিফিলিসের ক্ষত  বিদ্যমান (বিতর্কিত)


মাথা ও পিঠে ফোঁড়ার দাগ বিদ্যমান                                                    

কুঁচকিতে অস্ত্রোপচারের দাগ বিদ্যমান                 
 

ডান বাহুতে বাঘেরথাবার আঘাতের দাগ     
 

শিশ্নের নিম্নভাগে আচিল বিদ্যমান   
    
এ ছাড়াও এই দুই ব্যক্তির আলোকচিত্রে যথেষ্ট মিল আছে। হাঁটার ধরণ, গলার স্বর, এবং ভাবভঙ্গীতেও মিল রয়েছে। আঙুলের ছাপ নেয়ার পদ্ধতি এই মামলার সময়ে চালু ছিলো, কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে তা ব্যবহৃত হয়নি। ধারণা করা হয়, কুমার নরেন্দ্রনারায়ণ ১২ বছর আগে নিখোঁজ হওয়াতে তাঁর হাতের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা সম্ভব ছিলো না।

[তথ্য সুত্র : গাজীপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ভূমি সংস্কার বোর্ড, উইকিপিডিয়া]

পোস্টটি লিখেছেন-এডভোকেট আজাদী আকাশ।      

সুপ্রিয় পাঠক, পোস্টটি সম্পর্কে আপনার কোন মতামত থাকলে নিচে মন্তব্যের ঘরে জানাতে পারেন। এছাড়া আমাদের ব্লগে লিখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

COMMENTS

BLOGGER
নাম

অদ্ভুতুড়ে টক,2,অর্থ ও বাণিজ্য,3,আইন আদালত,21,আইন যোদ্ধা,1,আইন শৃঙ্খলা,1,আদালতে হাতেখড়ি,5,আফসার হাসান,2,ইতিহাস ও ঐতিহ্য,3,ইসলাম,2,ঈমান,1,উপন্যস,2,এডভোকেট আজাদী আকাশ,57,এডভোকেট আনিসুর রহমান,2,এডভোকেট খোরশেদ আলম,1,এন্ড্রয়েড,1,কবিতা,17,কাজী নজরুল ইসলাম,2,খেলাধুলা,1,গল্প,8,জীবনানন্দ দাস,1,তাবলীগ জামাত,1,তৈমূর আলম খন্দকার,6,দেওয়ানী আইন,9,ধর্মীয় টক,9,নারী অধিকার,1,নির্বাচন,3,নির্বাচিত টক,14,নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী,1,প্রকৃতি,1,প্রেস বিজ্ঞপ্তি,1,ফৌজদারি আইন,16,বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি,6,বিনোদন,2,বিবাহ,1,বিশেষ টক,7,ব্লগ,1,ভ্রমণ টক,2,মুক্ত টক,1,মোঃ মুঞ্জুরুল ইসলাম,1,যৌতুক,1,যৌন নির্যাতন,1,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,3,রম্যরচনা,1,রাজনীতি,11,রীট,1,রুদ্র রায়হান,9,রুবেল রানা,1,রেসিপি,2,লাইফস্টাইল,2,শিক্ষা,4,সম্পাদকীয় টক,16,সাহিত্য,20,সুকুমার রায়,3,স্বাস্থ্য টক,4,
ltr
item
Talkative Bangla- এসো বাংলায় মাতি উল্লাসে | বাংলা সোস্যাল ব্লগ সাইট : ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা- অদ্ভুত কিন্তু সত্য (২য় পর্ব)
ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা- অদ্ভুত কিন্তু সত্য (২য় পর্ব)
https://4.bp.blogspot.com/-fZavw_6OoHE/XAluDm1YTPI/AAAAAAAABGw/Tfx2PIpiOTUmoCy0khrnlm2WEjS5BbFsgCLcBGAs/s1600/talkativebangla.com1.jpg
https://4.bp.blogspot.com/-fZavw_6OoHE/XAluDm1YTPI/AAAAAAAABGw/Tfx2PIpiOTUmoCy0khrnlm2WEjS5BbFsgCLcBGAs/s72-c/talkativebangla.com1.jpg
Talkative Bangla- এসো বাংলায় মাতি উল্লাসে | বাংলা সোস্যাল ব্লগ সাইট
https://www.talkativebangla.com/2018/12/bhaowal-shannashi-case-study_7.html
https://www.talkativebangla.com/
https://www.talkativebangla.com/
https://www.talkativebangla.com/2018/12/bhaowal-shannashi-case-study_7.html
true
4497219040230755502
UTF-8
সকল পোস্ট লোড হয়েছে কোন পোস্ট পাওয়া যায়নি সব দেখুন বিস্তারিত পড়ুন Reply Cancel reply Delete By প্রথম পাতা বাকিটুকু পরবর্তী পাতায় দেখুন POSTS সব দেখুন আপনার জন্য আরও টক টক বিভাগ ARCHIVE আপনি খুজছেন সকল টক আপনার অনুরোধ অনুযায়ী কোন পোস্ট পাওয়া যায়নি। দয়া করে অন্যভাবে চেষ্টা করুন অথবা প্রথম পাতায় ফিরুন Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy