$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0

বাংলাদেশে চিন্তার স্বাধীনতা ও ভিন্নমত প্রসঙ্গে আমার ভাবনা

নির্দিস্ট ভূ-খন্ড, জনসমষ্টি, সরকার ও সার্বভৌম ক্ষমতা এ চারটি উপাদান নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। সমাজে বসবাসরত সকল মানুষের কল্যাণ ও সমস্যা সমা...

নির্দিস্ট ভূ-খন্ড, জনসমষ্টি, সরকার ও সার্বভৌম ক্ষমতা এ চারটি উপাদান নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। সমাজে বসবাসরত সকল মানুষের কল্যাণ ও সমস্যা সমাধানের জন্যই রাষ্ট্রের আর্বিভাব ঘটে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে রাষ্ট্রকে মনে করা হতো ঈশ্বরের সৃষ্টি করা একটি প্রতিষ্ঠান। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ রাষ্ট্রকে ‘সর্বজনীন কল্যাণ সাধনকারী’ এবং ‘মানুষের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য অপরিহার্য’ প্রতিষ্ঠান বলে ব্যাখ্যা করেছেন। আদিম মানুষ প্রথমে গোত্রভিত্তিক বসবাস করত। সময়ের পরিবর্তনে একসময় রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়। নাগরিকদের সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে বাঁচার জন্য রাষ্ট্র অনেক কাজ করে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই সমাজের সামগ্রিক উন্নতির জন্য, নাগরিকদের নৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশে কল্যাণমূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। আর এই ভূমিকা পালন করে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপুর্ণ উপাদান সরকার। সরকারের মাধমেই রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়ে থাকে।

একটি রাষ্ট্রকে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে হলে একটি পথ নির্দেশিকা থাকতে হয়। কোন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করার পর এর আবিষ্কারক যেমন উক্ত যন্ত্রটি পরিচালনার নিয়ম কানুন সম্পর্কিত একটি ম্যানুয়াল প্রকাশ করেন তেমনি মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করার পর তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য একটি ম্যানুয়াল দরকার হয়। এই ম্যানুয়ালটিই হলো একটি দেশের সংবিধান। একটি দেশের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন নিয়ম কানুন যেমন থাকে, তেমনি রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য বিশেষ কিছু অধিকার সন্নিবেশিত করা হয় যে অধিকার গুলোকে মৌলিক অধিকার বলা হয়। এই মৌলিক অধিকারগুলো অলঙ্ঘনীয়। এই মৌলিক অধিকারগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক যে কোন আইন, বিধি, বিধান, সিদ্ধান্ত, পদক্ষেপ বাতিল বলে গণ্য হয়। ১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পেয়েছি। রাষ্ট্র গঠন করেছি। এই রাষ্ট্রকে সুষ্ঠুভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার গঠন করেছি। চলতে চলতে রাষ্ট্র যেন পথ না হারায় সে জন্য প্রস্তুত করেছি একটি সংবিধান। আমাদের দেশের সংবিধানেও কিছু মৌলিক অধিকারের সন্নিবেশ ঘটেছে। এই অধিকারগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ন অধিকার হলো মানুষের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতা।


আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-
৩৯। (১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।
(২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে
(ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং
(খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার
নিশ্চয়তা দান করা হইল।

স্বভাবতই মানুষ চিন্তাশীল প্রাণী। মানুষ নিজেকে নিয়ে, নিজের পরিবার, আত্মীয় স্বজন, সমাজ সংস্কৃতি ও দেশকে নিয়ে চিন্তা করে। মানুষের চিন্তা চেতনা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যার জন্য দরকার হয় বাক স্বাধীনতার। বাক স্বাধীনতার মাধ্যমে মানুষের চিন্তার প্রকাশ ঘটে। যার ফলে অপরের পক্ষে উক্ত চিন্তা চেতনা সম্পর্কে জানবার সুযোগ হয়। মানুষ বাধাহীনভাবে তার চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ভোগ করতে পারলে এবং বাক স্বাধীনতার মাধ্যমে তার চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে পারলে জাতির উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। যে দেশে চিন্তা, বিবেক ও বাক স্বাধীনতার অভাব বা যে দেশে চিন্তা, বিবেক ও বাক স্বাধীনতাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় সে দেশ অন্ধকার গভীর গিরিখাদে এমনভাবে আছড়ে পড়ে যে সেখান থেকে টেনে উঠানো একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।যে সমাজে চিন্তা, বিবেক ও বাক স্বাধীনতা আছে সে সমাজে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতি বেশি পরিমাণে লক্ষ্য করা যায়।

চিন্তার অধিকার ব্যতিত কোন রাষ্ট্রের উন্নয়ন কল্পনাতীত। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো ও সক্রেটিসই, সম্ভবত, প্রথম এই অধিকারের কথা বলতে শুরু করেন। তৃতীয় শতাব্দীতে সম্রাট অশোকের কিছু পদক্ষেপ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় আনে। তবে ইউরোপের বাতাবরণে দার্শনিক থেমিসটাস, মন্টেইগনি, স্পিনোজা, ভলতেয়ারসহ আরো কয়েকজন মহাপ্রাণ বিষয়টিকে কয়েকধাপ এগিয়ে নেন। বিষয়টি আধুনিক পর্যায়ে আসে যখন রানী প্রথম এলিজাবেথ চিন্তার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আইন বাতিল করেন। এ সময়েই ইউরোপের নানা জনপদ থেকে ভিন্নমতবাদীরা ইংল্যান্ডে আশ্রয় পেতে থাকেন। ঠিক এ সময়েই ইতালিতে দার্শনিক ব্রুনোকে হত্যা করা হয়। কারণ তিনি তার মত পরিবর্তন করতে অস্বীকার করেন। বলা যায়, মুক্তচিন্তার ধারাবাহিক সংগ্রামে প্রথম শহিদ ব্রুনো।

স্বাধীনতার পর থেকে সামরিক বেসামরিক অনেকগুলো সরকারের অভিজ্ঞতা হয়েছে বাংলাদেশের। প্রত্যেক সরকারের মধ্যেই চিন্তা, বিবেক ও বাক স্বাধীনতা হরণের বিশেষ প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। স্বাধীন দেশের নাগরিকেরা পরাধীনতার স্বাদ অনুভব করতে বাধ্য হয়েছে। বিপরীত ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের কন্ঠরোধ করা হয়েছে। দমন পীড়ন চালিয়ে জনমনে ভিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় আসার পরে ভুলে গেছে একমত ও ভিন্নমত নিয়েই মানুষের সভ্যত। যেখানে চিন্তার স্বাধীনতা আছে সেখানে ভিন্ন মত থাকবেই। ভিন্ন মত আছে বলেই পৃথিবীটা এত সুন্দর এবং ছান্দিক মনে হয়। এত বৈচিত্র্যময় মনে হয়। যদি মতের ভিন্নতা না থাকতো এবং সবাই যদি প্রতিটি বিষয়ে একমত পোষণ করে তাহলে পৃথিবীটা যান্ত্রিক মনে হত। দুঃখজনকভাবে দেখি যে ব্যক্তিই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে তাদেরকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়। নির্যাতন করা হয়। একটি কথা ছোটবেলা থেকে পড়ে আসছি যে, তোমার প্রকৃত বন্ধু সেই যে তোমার ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আমার ভুল হওয়া বা আমি অন্যায় করা সত্বেও যে ব্যক্তি আমার সমালোচনা না করে বা আমার ভুল ধরিয়ে না দিয়ে উল্টো আমার প্রশংসা করে, সে যেমনই হোক আমার শুভাকাঙ্ক্ষী বা বন্ধু হতে পারে না।

কোন সরকারের পক্ষে এটা ভাবা সম্ভব নয় যে তারা কোন অন্যায় করে না বা অন্যায়ের প্রশ্রয় দেয় না বা ভুল করে না। ভুল বা অন্যায় যাইহোক সেটা যদি কেউ ধরিয়ে দেয় তাহলে সেটা সরকারের জন্যই তো মঙ্গল। সরকার তার ভুল বা অন্যায় শুধরে নিয়ে দেশকে আরো বেশি কার্যকরীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কোন একটি সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ যদি আমার মনোপূত না হয় তাহলে সেই সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমি যদি আমার ভিন্ন মতের প্রচার করি তাহলে সমস্যাটা কোথায় তা আমার বোধগম্য নয়। আমার মতামত যেমন আপনার পছন্দ নাও হতে পারে তেমন আপনার মতামতও আমার পছন্দ নাও হতে পারে। কোন ব্যক্তি সরকারের বিরুদ্ধে কোন কিছু যুক্তি দিয়ে লিখলে সরকার লিখিতভাবেই তা খন্ডাতে পারে। এজন্য ঐ লেখককে নির্যাতন, দমন, পীড়ন বা হয়রানি করার কোন যুক্তিসংগত কারণ দেখিনা। যুক্তির বিরুদ্ধে পালটা যুক্তি চলে দমন পীড়ন চলে না। সন্ত্রাস চলে না।

প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতের প্রতি ক্ষমতাসীন সরকারের ভূমিকা কেমন হবে সে সম্পর্কে মস্কো অবস্থানের শেষ দিনে ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইস্তেভেস্তিয়াকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেই সাক্ষাৎকারটি তখন ছাপানো হয়নি। ৫৮ বছর পর রাশিয়ায় তা প্রথম প্রকাশিত হয়। সেই সাক্ষাৎকারের মোদ্দাকথা ছিল এমন -

যদি আপনারা প্রতিপক্ষের অবস্থানের ভুল- ত্রুটির প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে থাকেন এবং এমনটা ভাবতে থাকেন যে, সে গুলো মানব- প্রকৃতিতে উত্তরাধিকার সুত্রে বর্তায়, যার ফলে তারা অনন্ত অভিশাপের যোগ্য, তাহলে আপনারা এমন এক চিন্তা ধারায় উপনীত হবেন, যার মধ্যকার ঘৃণ্য ও প্রতিশোধস্পৃহা একদিন আপনাদের নিজস্ব আদর্শের পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে দাড়াতে পারে এবং তাকে ধবংস করে ফেলতে পারে। আপনারা এক মহান আদর্শের জন্য কাজ করছেন। এ কারণে আপনাদেরকে চিন্তায় মহৎ হতে হবে; মহৎ হতে হবে করুণায়, উপলব্ধিতে, ধৈর্যে...।
যেখানে চিন্তার স্বাধীনতা আছে, সেখানে মতপার্থক্য থাকবেই। যদি আমাদের সকলেরমতামতকে বলপূর্বক এক করে দেয়া হতো, তাহলে পৃথিবীটা যে শুধু নিরস হতো তাই শুধু নয়, এটা হতো যান্ত্রিক নিয়ম কানুনে আবদ্ধ এক বন্ধা জগৎ। আপনাদের কাজের লক্ষ্য যদি সমগ্র মানবজাতি হয়ে থাকে, তাহলে এই জীবিত মানবজাতির স্বার্থে বিভিন্ন মতের অস্তিত্ব আপনাদেরকে স্বীকার করে নিতে হবে। মানুষের মতামত প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয় কেবলমাত্র বুদ্ধিবৃত্তির শক্তি এবং নৈতিক বিশ্বাসের স্বাধীন প্রয়োগের ফলে, হিংসা থেকে জন্ম নেয় হিংসা এবং অন্ধ মূর্খতা। সত্যোপলব্ধির জন্য প্রয়োজন চিন্তার স্বাধীনতা; সন্ত্রাস অবধারিতভাবে সত্যকে হত্যা করে। এক পশু অন্য পশুকে বশীভূত করতে পারে না। এটা কেবল মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

প্রতিটি দলই ক্ষমতায় যাওয়ার পর বাস্তবতাকে ভুলে গিয়ে প্রতিশোধস্পৃহার কারণে ভিন্ন মত ও দলকে দমন পীড়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশের অধিকার যে শুধু বাংলাদেশেই হরণ করা হয় তা নয়। যুগে যুগেই স্বাধীন মত প্রকাশের ‘অপরাধে’ দার্শনিক ও লেখককে শাস্তি পেতে হয়েছে, দেশ ছাড়া হতে হয়েছে, এমনকি মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। নাজি জার্মানিতে ভিন্ন মতাবলম্বী কারারুদ্ধ হয়েছেন, তাদের বইপুস্তক পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে ভিন্ন মত দমানো হয়েছে নানান কায়দায়। ধর্ম অপমানর দায়ে সৌদি লেখক রাইফ বাদাউইকে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০০০ বেত্রাঘাত দেয়া হয়েছে। ইরানে একের পর এক চলেছে মুক্তবুদ্ধির নিগ্রহ। পাকিস্তান আমলে স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রচুর নিগ্রহ সইতে হয়েছে। পাকিস্তানে আজো বহাল আছে ধর্ম রক্ষার নামে ভয়ঙ্কর সব রীতিনীতি, আছে ‘ব্লুাসফেমি’ আইন। পলপটের সময় কম্বোডিয়ায় ভিন্ন মতের বিরুদ্ধে নারকীয় নিগ্রহ চালানো হয়েছে। চীনে দমন-পীড়ন চলেছে ভিন্ন মতের বিরুদ্ধে। চিলিতে পিনোসেটের আমলে চলেছে ভয়াবহ নিপীড়ন। ফ্রাংকোর আমলে নিপীড়ন চলেছে স্পেনে।

যুগে যুগে শাসক শ্রেণী একই ভুলের পূণরাবৃত্তি কর চলেছে। শাস্ক শ্রেণী ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে ভুলে যায় যে, একজন মানুষকে শারীরিকভাবে বন্দি করা গেলেও তার চিন্তাকে বন্দি করা যায় না। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে আন্তনিও গ্রামসি। তিনি বিশ শতকের অন্যতম একজন মার্কসীয় চিন্তাবিদ। গ্রামসি ১৯২৪ সালে ইতালীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯২৬ সালে তাকে বন্দি করা হয় এবং ১৯২৮ সালে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকার তাকে ২০ বছরের সাজা দেয়। সাজা দেওয়ার সময় তাকে বলা হয়েছিল তার চিন্তা-ভাবনাকে ২০ বছর দমিয়ে রাখার জন্যই তাকে বন্দি করে রাখা হচ্ছে। কিন্তু গ্রামসি কারাগারে বসে ঠিকই তিরিশটা খাতা আর হাজার তিনেক পৃষ্ঠার খোলা কাগজে নিজের চিন্তা লিপিবদ্ধ করেন। এবং সেই লেখাগুলো গোপনে বাইরে পাঠিয়ে দেন। ১৯৫০ সালে তা ‘প্রিজন নোটবুকস’ নামে প্রকাশিত হয়। আর তার এই লেখাগুলোর খাতিরে তিনি হয়ে উঠেন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক ও তাত্ত্বিকদের মধ্যে একজন।

তবে কোনো স্বাধীনতাই অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন নয়, হওয়া উচিত নয়। এমন একটি মন্তব্যকে আপাতত অবারিত স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হলেও নিয়ম বা নিয়ন্ত্রণ না থাকার সংকট অনেক। রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্রের কথা ভিন্ন, সেখানে রাজা-রানী বা স্বৈরশাসকের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই আইন। এই ধরনের সমাজ ব্যবস্থার কথা, যেখানে মানুষ কার্যত বন্দিত্ব যাপন করে, মুক্তিবুদ্ধির চর্চা যেখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, এখানে উল্লেখের প্রয়োজন বোধ করিনে। তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোতে কিছু নিয়ম, রীতি বা বাধানিষেধের প্রয়োজন পড়ে বৈকি, পড়ে বৃহত্তর কল্যাণেই। সমস্যাটা সেখানেই যে, এই কল্যাণের গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সে কারণেই নিয়ম বা নিয়ন্ত্রণের অপব্যবহার ঘটে নানান সময়ে। স্বীকার করতে বাধ্য যে, স্বাধীনতা অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন হলে অনেক ক্ষেত্রেই তার অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হয় না। এক শ্রেণির মানুষ আছেন, জেনে বা না জেনে, যারা এর সুযোগ গ্রহণ করেন, নৈরাজ্য সৃষ্টি করেন এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ রক্ষার নামে অধিকারের সীমা অতিক্রম করেন। চিন্তা ও বাক স্বাধীনতা ব্যক্তির বিকাশের জন্য অপরিহার্য্য। আর ব্যক্তির বিকাশ ঘটলে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন সাধিত হবে। সভ্য সমাজ ও চিন্তার স্বাধীনতা একে অন্যের পরিপূরক। চিন্তার স্বাধীনতা ব্যতীত সভ্য সমাজের কল্পনা করা যায় না। আবার চিন্তার স্বাধীনতা বাস্তবিকভাবে উপভোগ করতে হলে বাক স্বাধীনতার দরকার হয়। বাক স্বাধীনতা ছাড়া চিন্তার স্বাধীনতার কোন মূল্য নেই। যদি কোন সরকার দাবি করে যে তারা দেশের উন্নয়নে বদ্ধ পরিকর এবং তারা দেশের উন্নয়নে কাজ করছে তবে সে সরকারকে অবশ্যই মানুষের চিন্তা, বিবেক ও বাক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান জানাতে হবে। সাদরে গ্রহণ করতে হবে ভিন্ন মত ও দলকে। তবেই উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আমরা অনেকটা এগিয়ে যেতে পারবো।               
     
পোস্টটি লিখেছেন-এডভোকেট আজাদী আকাশ।      
সুপ্রিয় পাঠক, পোস্টটি সম্পর্কে আপনার কোন মতামত থাকলে নিচে মন্তব্যের ঘরে জানাতে পারেন। এছাড়া আমাদের ব্লগে লিখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

COMMENTS

BLOGGER
নাম

অদ্ভুতুড়ে টক,2,অর্থ ও বাণিজ্য,3,আইন আদালত,20,আইন যোদ্ধা,1,আইন শৃঙ্খলা,1,আদালতে হাতেখড়ি,5,আফসার হাসান,2,ইতিহাস ও ঐতিহ্য,3,ইসলাম,2,ঈমান,1,উপন্যস,2,এডভোকেট আজাদী আকাশ,55,এডভোকেট আনিসুর রহমান,1,এডভোকেট খোরশেদ আলম,1,এন্ড্রয়েড,1,কবিতা,16,কাজী নজরুল ইসলাম,2,খেলাধুলা,1,গল্প,8,জীবনানন্দ দাস,1,তাবলীগ জামাত,1,তৈমূর আলম খন্দকার,6,দেওয়ানী আইন,9,ধর্মীয় টক,9,নারী অধিকার,1,নির্বাচন,3,নির্বাচিত টক,14,নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী,1,প্রকৃতি,1,প্রেস বিজ্ঞপ্তি,1,ফৌজদারি আইন,15,বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি,6,বিনোদন,2,বিবাহ,1,বিশেষ টক,7,ব্লগ,1,ভ্রমণ টক,2,মুক্ত টক,1,মোঃ মুঞ্জুরুল ইসলাম,1,যৌতুক,1,যৌন নির্যাতন,1,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,3,রম্যরচনা,1,রাজনীতি,11,রীট,1,রুদ্র রায়হান,9,রুবেল রানা,1,রেসিপি,2,লাইফস্টাইল,2,শিক্ষা,4,সম্পাদকীয় টক,16,সাহিত্য,19,সুকুমার রায়,3,স্বাস্থ্য টক,3,
ltr
item
Talkative Bangla- এসো বাংলায় মাতি উল্লাসে | বাংলা সোস্যাল ব্লগ সাইট : বাংলাদেশে চিন্তার স্বাধীনতা ও ভিন্নমত প্রসঙ্গে আমার ভাবনা
বাংলাদেশে চিন্তার স্বাধীনতা ও ভিন্নমত প্রসঙ্গে আমার ভাবনা
https://4.bp.blogspot.com/-KtAK_mJT2a4/XCNR-UclEEI/AAAAAAAABQM/_BJH4QCreqEkhY5WVlu-V3UFtiAqJOBgwCLcBGAs/s1600/images-1-picsay.jpeg
https://4.bp.blogspot.com/-KtAK_mJT2a4/XCNR-UclEEI/AAAAAAAABQM/_BJH4QCreqEkhY5WVlu-V3UFtiAqJOBgwCLcBGAs/s72-c/images-1-picsay.jpeg
Talkative Bangla- এসো বাংলায় মাতি উল্লাসে | বাংলা সোস্যাল ব্লগ সাইট
https://www.talkativebangla.com/2018/12/politics-freedom-of-speech.html
https://www.talkativebangla.com/
https://www.talkativebangla.com/
https://www.talkativebangla.com/2018/12/politics-freedom-of-speech.html
true
4497219040230755502
UTF-8
সকল পোস্ট লোড হয়েছে কোন পোস্ট পাওয়া যায়নি সব দেখুন বিস্তারিত পড়ুন Reply Cancel reply Delete By প্রথম পাতা বাকিটুকু পরবর্তী পাতায় দেখুন POSTS সব দেখুন আপনার জন্য আরও টক টক বিভাগ ARCHIVE আপনি খুজছেন সকল টক আপনার অনুরোধ অনুযায়ী কোন পোস্ট পাওয়া যায়নি। দয়া করে অন্যভাবে চেষ্টা করুন অথবা প্রথম পাতায় ফিরুন Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy