$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0

অহিংস ধর্ম প্রচারক থেকে ধীরে ধীরে সহিংস হয়ে উঠা তাবলীগ জামাত

তাবলীগ জামাত শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামের মহান বাণী সকলের নিকট পৌঁছে দেয়। কিন্তু এইই সহিংসতার কারণে তাদের ভাবমূর্তি বিশ্বের দরবারে ক্ষুণ্ণ হলো

ছোট বেলা থেকেই দেখে আসছি পাঞ্জাবী পাজামা ও টুপি পরিহিত একদল লোক (কিশোর থেকে বৃদ্ধ) কাধে বড় বড় ব্যাগ ঝুলিয়ে লাইন ধরে মুখে কি যেন বিড় বিড় করতে করতে এক মসজিদ থেকে আরেক মসজিদে আস্তানা গাড়ে। মসজিদে খায়, মসজিদে ঘুমায়। তারপর আসর নামাজ শেষে গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে যায় বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে। গ্রামের মানুষদেরকে নামাজ পড়তে বলে, রোজা রাখতে বলে,  সত্য কথা বলতে বলে। এছাড়া আরও অনেক ভাল ভাল কথা বলে। তারপর কিছু দিন থাকার পরে আবার অন্য মসজিদে আস্তানা গাড়ে। বুদ্ধি হওয়ার পর জেনেছি এদেরকে তাবলীগ জামাত বলা হয়। আমার নিকটেও অনেক বার তাবলীগ জামাতের মুসল্লিরা ইসলামের সুমহান বাণী পৌছে দিয়েছেন। ইচ্ছা থাকা সত্বেও বিভিন্ন কারণে তাবলীগ জামাতে যাওয়া হয়ে ওঠেনি কখনো। তাবলীগ জামাত সম্পর্কে পড়তে গিয়ে জানতে পেরেছি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুখ নিঃসৃত শাশ্বত বাণী: ‘তোমার কাছে যদি কোনো বাণী থাকে, তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’ এ দাওয়াতি আহ্বানকে কেন্দ্র করেই পর্যায়ক্রমে তাবলিগের বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রসার ঘটে।

উপমহাদেশের মুসলমানদের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে তাবলিগ জামাতের শুভ সূচনা হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও সাধক হজরত মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভি (১৮৮৫-১৯৪৪ খ্রি.) দাওয়াতে তাবলিগ জামাতের পুনর্জাগরণ করেন। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী দিল্লির দক্ষিণ পাশে অবস্থিত এক জনবিরল নীরব অঞ্চল ‘মেওয়াত’। চারিত্রিক বিপর্যস্ত ধর্মকর্মহীন, অশিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন নামেমাত্র মুসলমান ‘মেও’ জনগোষ্ঠীকে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, ধর্মের পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন ও কালেমার দাওয়াতি মর্ম শিক্ষাদান এবং বিভ্রান্তির কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রা.) তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন। ১৩৪৫ হিজরিতে দ্বিতীয় হজ থেকে ফিরে এসে তিনি তাবলিগি গাশ্ত শুরু করলেন, জনসাধারণের মধ্যে কালেমা ও নামাজের দাওয়াত দিতে লাগলেন। তাবলিগ জামাত বানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বের হওয়ার দাওয়াত দিলেন, এভাবে গ্রামে গ্রামে সৎ কাজ করার জন্য জামাত তৈরি করে দিতেন। কয়েক বছর মেওয়াতে এ পদ্ধতিতে দাওয়াতি কাজ অব্যাহত থাকল।



১৩৫২ হিজরিতে তৃতীয় হজ পালনের পর তিনি বুঝতে পারলেন যে গরিব মেওয়াতি কৃষকদের পক্ষে দ্বীন শেখার সময় পাওয়া কষ্টকর। ঘরসংসার ছেড়ে মাদ্রাসায় দ্বীন শেখাও অসম্ভব। ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে সামগ্রিক জীবন পাল্টে দেওয়া বা জাহেলি বিশ্বাসকে পরিবর্তন করাও সম্ভব নয়। তাই ক্ষুদ্র দল বা ছোট জামাত আকারে ইলমি ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোয় গিয়ে সময় কাটানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন এবং ধর্মীয় পরিবেশে তালিম দিতে আরম্ভ করলেন। সেসব ধর্মীয় মজলিসে ওলামা-মাশায়েখদের ওয়াজ-নসিহতের পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিয়মনীতি বাতলে দেওয়া হতো। মানুষ দ্বীনদার পরহেজগার লোকদের জীবনযাপন, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চালচলন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। শুরুতে তাবলিগি কার্যক্রম ব্যাপক সমর্থন পায়নি, কিন্তু ধীরে ধীরে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম।

প্রথম ইজতেমা ১৯৪১ সালে দিল্লির নিজামউদ্দীন মসজিদের ছোট এলাকা মেওয়াতের নুহ মাদ্রাসায় আয়োজন করা হয়। এতে প্রায় ২৫ হাজার তাবলিগ দ্বীনদার মুসলমান অংশ নেন। এভাবে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে মেওয়াতের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার কিছু মানুষের কাছে দ্বীনের কথা প্রচারের মধ্য দিয়ে তাবলিগ জামাতের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশে ১৯৪৬ সালে ঢাকার রমনা পার্কসংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে তাবলিগ জামাতের বার্ষিক সম্মেলন বা ইজতেমা প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে তৎকালীন হাজি ক্যাম্পে ইজতেমা হয়, ১৯৫৮ সালে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন এটা কেবল ইজতেমা হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতিবছর ইজতেমায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আশাতীতভাবে বাড়তে থাকায় ১৯৬৬ সালে ইজতেমা টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয়। ওই বছর স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অংশ নেওয়ায় ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬৭ সাল থেকে বর্তমান অবধি (২০১১ সাল থেকে দুই পর্বে) ‘বিশ্ব ইজতেমা’ টঙ্গীর কহর দরিয়াখ্যাত তুরাগ নদের উত্তর-পূর্ব তীরসংলগ্ন ডোবা-নালা, উঁচু-নিচু মিলিয়ে রাজউকের হুকুমদখলকৃত ১৬০ একর জায়গার বিশাল খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। (সুত্রঃ প্রথম আলো)

বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের প্রধান কেন্দ্র ঢাকার কাকরাইল মসজিদ। ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিশ্ব ইজতেমা শান্তিপূর্ণই ছিল। কিন্তু গত বছর হঠাৎ করে তাবলীগ জামাত দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক গ্রুপ মাওলানা  সাদ ও অন্য গ্রুপ মাওলানা জুবায়েরকে তাদের নেতা হিসেবে মানেন। নির্বাচনের কারণে এবং তাবলীগ জামাত দু গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় এবারের বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত রাখা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল।

কিন্তু হঠাৎ করে জোড় ইজতেমা উপলক্ষে মাওলানা জুবায়ের গ্রুপের তাবলিগ জামাতের মুসল্লিরা ইজতেমা ময়দানে আগে থেকেই অবস্থান নিয়েছিল। শনিবার (০১/১২/২০১৮) সকাল থেকেই সাদ গ্রুপের অনুসারীরা ইজতেমা ময়দান এলাকায় আসতে শুরু করে এবং ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে বিশ্ব ইজতেমা ময়দান ও এর আশে পাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

সাদ গ্রুপের মুসল্লিরা ইজতেমা মাঠের চারপাশ এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে পশ্চিম লেনে অবস্থান নেন। এতে ওই লেনে যানবাহন চলাচল বিঘ্ন হয়। এদিকে উভয় গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে দুপুরের দিকে সাদ গ্রুপের মুসল্লিরা জুবায়ের গ্রুপের মুসল্লিদের উপর হামলা চালায়। এতে একজন মুসল্লি নিহত ও প্রায় শতাধিক মুসল্লি আহত হন। রক্তাক্ত অবস্থায় আহত মুসল্লিদের টঙ্গী হাসপাতালে আনা হয়। সেখান থেকে গুরুত্বর আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। (সুত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক)

যদিও তাবলীগ জামাত নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে, তাবলীগ জামাতকে আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক পছন্দ করি। তাবলীগ জামাতের মুসল্লিদের অহিংস ইসলাম প্রচার, অমায়িক ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করতো। তাবলীগ জামাতের সব থেকে যে বিষয়টি আমার ভাল লাগতো সেটা হলো কোন ব্যক্তি একবার তাবলীগ জামাতের সাথি হলে তার মধ্যে আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ভাল ব্যবহার, নামাজ রোজা, দাড়ি রাখা, টুপি ও পাঞ্জাবী পাজামা পরাসহ নানা ভাল ভাল গুণে তিনি গুণান্বিত হয়ে যান। এটাকে অবশ্যই আমি আল্লাহর রহমত বলে মনে করি। কিন্তু আজকের ঘটনা তাবলীগ জামাতের ইতিহাসে একটি লজ্জাজনক ঘটনা হিসেবে রেকর্ড হয়ে থাকলো। অহিংস ইসলাম প্রচারক  তাবলীগ জামাত আজ সহিংসতার পথ ধরলো। জানিনা এর পেছনে গভীর কোন ষড়যন্ত্র আছে কিনা। তবে বিশ্বের দরবারে তাবলীগ জামাতের ভাব মূর্তি যেমন নষ্ট  হলো তেমনি নষ্ট  হলো জাতি হিসেবে বাংলাদেশের ভাব মূর্তি।  তাবলীগ জামাতের মত অহিংস ইসলাম প্রচারক দল যখন সহিংস হয়ে উঠে তখন মনে প্রশ্নের উদয় হয় প্রকৃত ইসলামের অনুসারী দল আসলেই দেশে আছে কিনা।

পোস্টটি লিখেছেন-এডভোকেট আজাদী আকাশ।      

সুপ্রিয় পাঠক, পোস্টটি সম্পর্কে আপনার কোন মতামত থাকলে নিচে মন্তব্যের ঘরে জানাতে পারেন। এছাড়া আমাদের ব্লগে লিখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

COMMENTS

BLOGGER
নাম

অদ্ভুতুড়ে টক,2,অর্থ ও বাণিজ্য,3,আইন আদালত,23,আইন যোদ্ধা,1,আইন শৃঙ্খলা,1,আদালতে হাতেখড়ি,5,আফসার হাসান,2,ইতিহাস ও ঐতিহ্য,3,ইসলাম,2,ঈমান,1,উপন্যস,2,এডভোকেট আজাদী আকাশ,57,এডভোকেট আনিসুর রহমান,7,এডভোকেট খোরশেদ আলম,1,এন্ড্রয়েড,1,কবিতা,22,কাজী নজরুল ইসলাম,2,খেলাধুলা,1,গল্প,8,জীবনানন্দ দাস,1,তাবলীগ জামাত,1,তৈমূর আলম খন্দকার,6,দেওয়ানী আইন,10,ধর্মীয় টক,9,নারী অধিকার,1,নির্বাচন,3,নির্বাচিত টক,14,নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী,1,প্রকৃতি,1,প্রেস বিজ্ঞপ্তি,1,ফৌজদারি আইন,16,বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি,7,বিনোদন,2,বিবাহ,1,বিশেষ টক,7,ব্লগ,1,ভ্রমণ টক,2,মুক্ত টক,1,মোঃ মুঞ্জুরুল ইসলাম,1,যৌতুক,1,যৌন নির্যাতন,1,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,3,রম্যরচনা,1,রাজনীতি,11,রীট,1,রুদ্র রায়হান,9,রুবেল রানা,1,রেসিপি,2,লাইফস্টাইল,2,শিক্ষা,4,সম্পাদকীয় টক,16,সাহিত্য,25,সুকুমার রায়,3,স্বাস্থ্য টক,4,
ltr
item
Talkative Bangla- এসো বাংলায় মাতি উল্লাসে | বাংলা সোস্যাল ব্লগ সাইট : অহিংস ধর্ম প্রচারক থেকে ধীরে ধীরে সহিংস হয়ে উঠা তাবলীগ জামাত
অহিংস ধর্ম প্রচারক থেকে ধীরে ধীরে সহিংস হয়ে উঠা তাবলীগ জামাত
তাবলীগ জামাত শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামের মহান বাণী সকলের নিকট পৌঁছে দেয়। কিন্তু এইই সহিংসতার কারণে তাদের ভাবমূর্তি বিশ্বের দরবারে ক্ষুণ্ণ হলো
https://2.bp.blogspot.com/-s3b1yedUL_E/XAKtsUhRv1I/AAAAAAAABBw/PyLynwlNePwEpbljvZxLNCEmnrwgeiceQCLcBGAs/s1600/Imjured03-picsay.jpg
https://2.bp.blogspot.com/-s3b1yedUL_E/XAKtsUhRv1I/AAAAAAAABBw/PyLynwlNePwEpbljvZxLNCEmnrwgeiceQCLcBGAs/s72-c/Imjured03-picsay.jpg
Talkative Bangla- এসো বাংলায় মাতি উল্লাসে | বাংলা সোস্যাল ব্লগ সাইট
https://www.talkativebangla.com/2018/12/religion-editorial-tablig-jamat.html
https://www.talkativebangla.com/
https://www.talkativebangla.com/
https://www.talkativebangla.com/2018/12/religion-editorial-tablig-jamat.html
true
4497219040230755502
UTF-8
সকল পোস্ট লোড হয়েছে কোন পোস্ট পাওয়া যায়নি সব দেখুন বিস্তারিত পড়ুন Reply Cancel reply Delete By প্রথম পাতা বাকিটুকু পরবর্তী পাতায় দেখুন POSTS সব দেখুন আপনার জন্য আরও টক টক বিভাগ ARCHIVE আপনি খুজছেন সকল টক আপনার অনুরোধ অনুযায়ী কোন পোস্ট পাওয়া যায়নি। দয়া করে অন্যভাবে চেষ্টা করুন অথবা প্রথম পাতায় ফিরুন Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy