$type=ticker$count=12$cols=4$cate=0

ভারতের গোরক্ষা নীতি-গরুর চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান

ভারত গরু পূজা নিয়ে মারাত্মক বাড়াবাড়ি করে ফেলে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিকট মানুষের চেয়ে গরুর মূল্য অনেক বেশি।

আজ সকালে পত্রিকার পাতা খুলতেই চোখ আটকে গেল একটি খবরে। গো-হত্যার গুজবে ফের উত্তপ্ত ভারত। ভারতের উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে আজ (০৪/১২/২০১৮) সোমবার পুলিশসহ ২ জন নিহত হয়েছে।জানা গেছে বুলন্দশহরের স্যানা মহকুমা এলাকায় মাহু গ্রামের বাইরে একটি মাঠে প্রায় ২৫টি গরুর মাংস পড়ে আছে বলে গুজব রটে। এর জেরে গতকাল প্রতিবাদে নামে ওই এলাকার শত শত মানুষ। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যান পুলিশ। এতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে পুলিশের।


শুধু এবারই প্রথম নয়। গোমাংস ভক্ষণ ও গরু জবাইয়ের অপরাধে ভারতে অনেক নিরাপরাধ  মানুষ কে এর আগেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। নির্যাতন করা হয়েছে। বাড়িঘর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে বিনা মূল্যে গরুর খাবার দেওয়া হবে—গত ডিসেম্বরে এমন ঘোষণা দেয় উত্তর প্রদেশের বুন্দেলখন্ডের স্থানীয় এক কলেজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ ঘোষণা দিয়ে কেবল একটা পোস্ট দেওয়া হয়। তিনশ র মতো গরুকে খাওয়ানোর ইচ্ছে ছিল কর্তৃপক্ষের। তবে ঘটনার দিন এক এলাহি কাণ্ড। বিভিন্ন এলাকা থেকে খামারিরা নিয়ে আসেন ৭ হাজার গরু। আরও ১৫ হাজার গরু নিয়ে আসা খামারিদের রীতিমতো মারধর করে বিদায় করে পুলিশ ও কলেজের কর্মচারীরা। হুটোপুটি, কোলাহল, মারধরে মারা যায় কয়েকজন। ওই জায়গাতেই আত্মহত্যা করেন উত্তর প্রদেশের এক কৃষক। হতভাগ্য ওই কৃষকের অভিযোগ ছিল, মানুষের ফেলে যাওয়া গরু তাঁর খেতের ফসল নষ্ট করে দিয়েছে। দুই লাখ রুপি ধার করে আবাদ করেছিলেন। কিন্তু এখন খাবার নেই, কিন্তু রয়েছে ঋণের খড়্গ। সেই কষ্টেই পৃথিবী ছাড়লেন তিনি।

এই হলো ভারতের গোরক্ষা নীতির হালনাগাদ প্রভাব। শুধু উত্তর প্রদেশ নয়, ভারতজুড়েই গোরক্ষার নামে চলছে অরাজকতা। সরকারের ধর্মীয় রাজনীতি এখন বুমেরাং হয়ে সরকারের ওপরই আঘাত হেনেছে। ভারতের মূলধারার গণমাধ্যম গরু পুষে বিপাকে পড়া গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে নিয়মিত লিখছে। সম্প্রতি ভারতের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ইন্ডিয়া টুডে এ ব্যাপারে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। মানবাধিকার সংগঠন পিইউডিআর তাদের প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, গোরক্ষার নামে কীভাবে অপরাধ ও অপরাধের অর্থনীতির বিস্তার ঘটছে ভারতে।

সম্প্রতি প্রকাশিত পিপলস ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেটিক রাইটসের (পিইউডিআর) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতে গোরক্ষার নামে বাড়াবাড়ির মোট ১৩৭টি ঘটনা ঘটে, যাতে মৃত্যু হয় ২৯ জনের। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে যেভাবেই হোক গরু রক্ষা করতে হবে। সে মানুষ মেরে হোক, কৃষকের জীবন ফসল নষ্ট করে হোক। গরু রক্ষায় বিজেপি সরকারের প্রচেষ্টা দেখলে এমনটা ভেবে নেওয়া যায় যে মানুষের চেয়ে গরুর মূল্য বেশি। বাজেটেও গরুর কল্যাণে বরাদ্দ থাকছে বেশি। [সুত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো]


হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা গোহত্যা এবং গো মাংস খাওয়া মহাপাপের কাজ বলে মনে করেন।  এর কারণ হলো হিন্দুদের সকল শাখা ও সম্প্রদায় গোজাতির মহত্ত্ব ও পবিত্রতা স্বীকার করে। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, স্মৃতি সকল শাস্ত্রে গোজাতির প্রতি অসাধারণ সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে। বৃহৎপরাশরস্মৃতিতে গোজাতির মহত্ত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে - গরুকে স্পর্শ করলে পাপ দূর হয়, গরুর সেবা করলে বিত্তলাভ হয়, গোদান করলে স্বর্গলাভ হয়; গরুর  মস্তকে ব্রহ্মা, স্কন্ধে শিব, পৃষ্ঠে নারায়ণ এবং চরণে বেদসমূহ অবস্থান করেন। গাভীর লোমে অন্যান্য দেবতারা অবস্থান করেন। গরু সর্বদেবময় এবং গরুর প্রতি ভক্তি করলে হরি তুষ্ট হন। তাই গরুর সেবা করলে সকল দেবতা তুষ্ট হন। দেবলের মতে গরু অষ্টমঙ্গলের অন্যতম (অষ্টমঙ্গল: ব্রাহ্মণ, গরু, অগ্নি, স্বর্ণ, ঘৃত, সূর্য, জল, রাজা)। গরুকে দর্শন, নমস্কার, অর্চনা ও প্রদক্ষিণ করলে আয়ু বৃদ্ধি হয়। ব্রহ্মপুরাণে বলা হয়েছে, গাভীকে প্রদক্ষিণ করলে সপ্তদ্বীপা পৃথিবী ভ্রমণের ফল হয়। বিষ্ণুপুরাণ মতে গরুর মল, মূত্র, ক্ষীর, ঘৃত, দধি ও রোচনা পরম পবিত্র ও বহুগুণযুক্ত।   [বাংলাপিডিয়া]


মানব শিশুর জন্মের ছয় দিনে যেমন একটি অনুষ্ঠান করা হয়, তেমনি গাভীর বাচ্চা প্রসবের তের অথবা একুশ দিনে ত্রিনাথের মেলা নামে একটি অনুষ্ঠান করা হয়। এর আগ পর্যন্ত গাভীর দুধ গরম করা হয় না। পৌষ মাসের শেষরাতে গরুর উদ্দেশে একটি অনুষ্ঠান করা হয়। গরুর পা ধুইয়ে কপালে সিঁদুরের ফোটা দিয়ে গায়ে চালের গুঁড়োর ছাপ দেওয়া হয়। নতুন ধানের চাল গুঁড়ো করে পিঠা বানিয়ে গরুকে খাওয়ানো হয় এবং নিজেদেরও খেতে হয়। পরে, তিনদিন গরুকে স্নান করানো হয় না। ফালগুন মাসের শেষদিন গরুর মঙ্গল কামনায় গোরোখ বা ঘণ্টাকর্ণ নামে এক পূজার আয়োজন করা হয়। পায়েসাদি মিষ্ট দ্রব্য দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। নতুন গরু কিনে বাড়িতে আনলে তার পা ধুইয়ে সিঁদুরের ফোটা দেওয়া হয়। গরুর প্রতি এরূপ সম্মান প্রদর্শন করা হয় বলেই হিন্দুরা কখনো গরুর গায়ে পা দেয় না। ধনী-দরিদ্র সকলেই যত্নপূর্বক গোজাতির সেবা-শুশ্রূষা করে। অতি প্রাচীনকালে ভারতবর্ষের অনেক রাজাই গরু পুষতেন। মহাভারতে আছে, বিরাট রাজার ষাট হাজার গাভী ছিল। আইন-ই-আকবরী পাঠে জানা যায়, মুঘল সম্রাট আকবরেরও বহুশত গাভী ও বলদ ছিল। তিনি মুসলমান হয়েও ভারতবর্ষে গোহত্যা নিষিদ্ধ করেছিলেন। [বাংলাপিডিয়া]

পৃথিবীতে এমন কোন ধর্মের সন্ধান পাওয়া যাবে না যে ধর্ম শান্তির কথা বলে না, মানবতার কথা বলে না। হোক সে ধর্ম একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী বা বহুত্ববাদে। প্রত্যক ধর্মে মানুষকে সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।মানুষ যে আশরাফুল মাখলুকাত, সেরা জীব, সেই সেরা জীব হয়ে মানুষকে ভালোবাসার জন্য, মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করে তোলার জন্য সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সেই জ্ঞান দিয়েছেন।মানুষের জন্যই ধর্ম। ধর্মের জন্য মানুষ নয়।ধর্ম কেবলই কোনো তত্ত্ব নয়, ধর্ম হচ্ছে অনুশীলনের বিষয়, পালনের বিষয়। স্রষ্টা যেমন কেবল একজন, ধর্মও কিন্তু একটি। আলাদা সম্প্রদায় হলেও সব মানুষের কিন্তু একই ধর্ম। এই পৃথিবী মহামানবদের পদস্পর্শে পবিত্র, আলোড়িত, সুশোভিত। যুগে যুগে যে অবতার, পয়গম্বররা এসেছেন তারা একটা বার্তাই নিয়ে এসেছেন। সেটা হলো মানবতাবোধ, মনুষ্যত্ববোধ। চণ্ডিদাস লিখেছেন  ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ গরু রক্ষা করতে গিয়ে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ হত্যা করা কেমন ধর্ম পালন তা আমার জানা নেই। যে ব্যক্তি ধর্ম পালনের দোহাই দিয়ে বিনা অপরাধে এবং যুক্তিহীন ভাবে মানুষ হত্যা করতে পারে তাকে ধর্মের লেবাস ধারী ভন্ড ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। ধর্ম মানুষকে সহনশীল হতে বলে, উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে বলে, মানুষকে ভালবাসতে বলে, মানবতাবাদী হতে বলে। মানুষকে কষ্ট দিয়ে, মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, মানুষ হত্যা করে ধর্ম পালন করা যায় না।

মানবতার কবি, গণ মানুষের কবি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার বিখ্যাত মানুষ কবিতায় লিখে গেছেন 'গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান'।   তিনি আরও বলেছিলেন, ‘কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক কে বলে তা বহুদূর, মানুষের মাঝেই স্বর্গ নরক মানুষেতেই সুরাসুর।পৃথবীর সব কিছুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে তিনি মানুষের জয়গান গেয়েছেন। মানুষকে উঠিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের গরু  নিয়ে  এমন বাড়াবাড়ি দেখে আজ কবি বেচে থাকলে তিনি তার কবিতা সংশোধন করে হয়তো লিখতেন  'গাহি সাম্যের গান, গরুর চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান'।


পোস্টটি লিখেছেন-এডভোকেট আজাদী আকাশ।      

সুপ্রিয় পাঠক, পোস্টটি সম্পর্কে আপনার কোন মতামত থাকলে নিচে মন্তব্যের ঘরে জানাতে পারেন। এছাড়া আমাদের ব্লগে লিখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

COMMENTS

BLOGGER: 2
Loading...
নাম

অদ্ভুতুড়ে টক,2,অর্থ ও বাণিজ্য,3,আইন আদালত,22,আইন যোদ্ধা,1,আইন শৃঙ্খলা,1,আদালতে হাতেখড়ি,5,আফসার হাসান,2,ইতিহাস ও ঐতিহ্য,3,ইসলাম,2,ঈমান,1,উপন্যস,2,এডভোকেট আজাদী আকাশ,57,এডভোকেট আনিসুর রহমান,5,এডভোকেট খোরশেদ আলম,1,এন্ড্রয়েড,1,কবিতা,20,কাজী নজরুল ইসলাম,2,খেলাধুলা,1,গল্প,8,জীবনানন্দ দাস,1,তাবলীগ জামাত,1,তৈমূর আলম খন্দকার,6,দেওয়ানী আইন,9,ধর্মীয় টক,9,নারী অধিকার,1,নির্বাচন,3,নির্বাচিত টক,14,নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী,1,প্রকৃতি,1,প্রেস বিজ্ঞপ্তি,1,ফৌজদারি আইন,16,বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি,6,বিনোদন,2,বিবাহ,1,বিশেষ টক,7,ব্লগ,1,ভ্রমণ টক,2,মুক্ত টক,1,মোঃ মুঞ্জুরুল ইসলাম,1,যৌতুক,1,যৌন নির্যাতন,1,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,3,রম্যরচনা,1,রাজনীতি,11,রীট,1,রুদ্র রায়হান,9,রুবেল রানা,1,রেসিপি,2,লাইফস্টাইল,2,শিক্ষা,4,সম্পাদকীয় টক,16,সাহিত্য,23,সুকুমার রায়,3,স্বাস্থ্য টক,4,
ltr
item
Talkative Bangla- এসো বাংলায় মাতি উল্লাসে | বাংলা সোস্যাল ব্লগ সাইট : ভারতের গোরক্ষা নীতি-গরুর চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান
ভারতের গোরক্ষা নীতি-গরুর চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান
ভারত গরু পূজা নিয়ে মারাত্মক বাড়াবাড়ি করে ফেলে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিকট মানুষের চেয়ে গরুর মূল্য অনেক বেশি।
https://3.bp.blogspot.com/-TWomvJgyeuQ/XAZmG3kQu2I/AAAAAAAABDI/UGax4YKjDto-216WNDKfDbhorAevzG7awCLcBGAs/s1600/talkativebangla.com2.jpg
https://3.bp.blogspot.com/-TWomvJgyeuQ/XAZmG3kQu2I/AAAAAAAABDI/UGax4YKjDto-216WNDKfDbhorAevzG7awCLcBGAs/s72-c/talkativebangla.com2.jpg
Talkative Bangla- এসো বাংলায় মাতি উল্লাসে | বাংলা সোস্যাল ব্লগ সাইট
https://www.talkativebangla.com/2018/12/selected-cow-worship-india.html
https://www.talkativebangla.com/
https://www.talkativebangla.com/
https://www.talkativebangla.com/2018/12/selected-cow-worship-india.html
true
4497219040230755502
UTF-8
সকল পোস্ট লোড হয়েছে কোন পোস্ট পাওয়া যায়নি সব দেখুন বিস্তারিত পড়ুন Reply Cancel reply Delete By প্রথম পাতা বাকিটুকু পরবর্তী পাতায় দেখুন POSTS সব দেখুন আপনার জন্য আরও টক টক বিভাগ ARCHIVE আপনি খুজছেন সকল টক আপনার অনুরোধ অনুযায়ী কোন পোস্ট পাওয়া যায়নি। দয়া করে অন্যভাবে চেষ্টা করুন অথবা প্রথম পাতায় ফিরুন Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy